২৩ অক্টোবর ২০২৬
প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোনোর আগেই শিক্ষাজীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে অনেক শিশু। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ধরে রাখার নানা উদ্যোগের মধ্যেও এক বছরের ব্যবধানে প্রাথমিক শিক্ষায় ঝরে পড়ার হার ১৩ দশমিক ১৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে ঝরে পড়া হিসেবে চিহ্নিত শিক্ষার্থীদের সবাই শিক্ষার বাইরে চলে যাচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তাদের একাংশ সাধারণ বিদ্যালয় ছেড়ে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল ও মাদ্রাসায় চলে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে। ফলে প্রকৃত ঝরে পড়া ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের চিত্র আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি বলে মনে করছেন শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা।
সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ শিক্ষা পরিসংখ্যান প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিপিই) বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় শুমারি (এপিএসএস) ২০২৪ প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে ব্যানবেইস।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে প্রাথমিক শিক্ষায় ঝরে পড়ার হার ছিল ১৩ দশমিক ১৫ শতাংশ। ২০২৪ সালে তা বেড়ে ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশ হয়েছে। এর আগে ২০২১ সালে এ হার ছিল ১৪ দশমিক ১৫ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ১৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ। ২০২৩ সালে কমে ১৩ দশমিক ১৫ শতাংশে নেমে এলেও পরের বছর আবার বেড়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষায় ঝরে পড়ার হার ২০১০ সালে ছিল ৩৯ দশমিক ৮০ শতাংশ। পরবর্তী বছরগুলোতে বিভিন্ন সময়ে এ হার কমেছে। ফলে দীর্ঘ ১৪ বছর কমার পর ফের ঝরে পড়ার হার বেড়েছে।
ঝরে পড়া ঠেকাতে উদ্যোগ সরকারের
দীর্ঘদিনের নিম্নমুখী প্রবণতার পর ২০২৪ সালে আবারও ঝরে পড়ার হার বেড়ে যাওয়ায় প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ সামনে এসেছে।
প্রাথমিক শিক্ষায় ঝরে পড়া কমাতে শিশুদের জন্য যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, তা জানিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) শাহীনা ফেরদৌসী বলেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে শিশুদের শিক্ষা থেকে ঝরে পড়তে না দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। একটি শিশুও যেন প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বাদ না পড়ে, সেটিই মূল উদ্দেশ্য।
এ বিষয়ে তিনি আরও বলেন, বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এবং বিভিন্ন এলাকার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। শিশুদের জামা, জুতা, ব্যাগ এবং মিড-ডে মিলের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া বিনা মূল্যে বই দেওয়ার কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।
শিক্ষাকে আনন্দময় করে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, শিশুরা যেন শ্রেণিকক্ষে আনন্দের সঙ্গে আসতে পারে, সে বিষয়েও কাজ করা হচ্ছে। এ জন্য ‘আনন্দের স্কুল’সহ বিভিন্ন কার্যক্রম রয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে ঝরে পড়া রোধের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়নের জন্য প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। অনলাইনসহ বিভিন্ন কার্যক্রমও শিশুদের কেন্দ্র করে পরিচালিত হচ্ছে। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য, শিশুরা যেন আনন্দের সঙ্গে বিদ্যালয়ে আসে, বিদ্যালয়ে থাকে এবং পড়াশোনা করে।
শিশুদের শুধু দক্ষতা উন্নয়ন নয়, ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা এবং তাদের মানবিক গুণাবলির বিকাশের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে বলে জানান তিনি। এ জন্য খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের আয়োজন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, গত বছর ফুটবল প্রতিযোগিতাসহ জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এসব প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে এবং সেগুলো ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়েছে। এ ধরনের কার্যক্রমের মাধ্যমে শিশুদের বিদ্যালয়মুখী রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
পাশাপাশি উপবৃত্তিসহ অন্যান্য ব্যবস্থাও রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, উপবৃত্তির ব্যবস্থা রয়েছে এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থাও আছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে ঝরে পড়া কমানোর চেষ্টা চলছে। ভবিষ্যতে এ বিষয়ে আরও পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সবাই ঝরে পড়ছে না, অনেকেই বদলাচ্ছে প্রতিষ্ঠান
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর শুধু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর তথ্য দিয়ে থাকে। ফলে ঝরে পড়া হিসেবে চিহ্নিত শিক্ষার্থীদের একটি অংশ আসলে শিক্ষার বাইরে চলে যাচ্ছে না। বরং এক ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে অন্য ধরনের প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরিত হচ্ছে বলে মনে করছেন শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানবিদ (পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ) আমিনুল হক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ঝরে পড়ার তথ্যগুলো শুধু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নেওয়া হয়।
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক মো. ফজলুর রহমান বলেন, প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার পেছনে একটি নয়, অনেকগুলো কারণ রয়েছে। যারা ঝরে পড়ছে বলে দেখানো হচ্ছে, তাদের একটি বড় অংশ সামর্থ্য অনুযায়ী ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে যাচ্ছে। আরেকটি অংশ মাদরাসায় চলে যাচ্ছে। তারা কিন্তু শিক্ষার সঙ্গে থাকছে। শুধু একটি প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে যাচ্ছে। অর্থাৎ, পুরোপুরি ঝরে পড়ার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের বিষয়টিও রয়েছে। আমার মনে হয়, এর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের হারই বেশি।
করোনার সময় শুরু, এখনো চলছে মাদরাসায় যাওয়ার প্রবণতা
প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শিক্ষার্থীদের অন্য ধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলে যাওয়ার প্রবণতা করোনাভাইরাস মহামারির সময় থেকে শুরু হয়েছে বলে মনে করেন শিক্ষাবিদেরা ।
এ বিষয়ে অধ্যাপক মো. ফজলুর রহমান বলেন, শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার এই প্রবণতা মূলত করোনাভাইরাস মহামারির সময় থেকে শুরু হয়েছে। তখন সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকলেও মাদ্রাসাগুলো খোলা ছিল। অনেক অভিভাবক সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ না রেখে মাদ্রাসায় পাঠিয়েছেন। সেই প্রবণতা এখনো চালু রয়েছে, বন্ধ হয়নি। এখন হয়তো গবেষণার মাধ্যমে বিষয়টি সামনে আসছে। এ কারণে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার তথ্য বিশ্লেষণের সময় প্রকৃতপক্ষে যারা শিক্ষার বাইরে চলে যাচ্ছে, তাদের সঙ্গে এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরিত হওয়া শিক্ষার্থীদের আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।